যে কারণে মেসিদের এ সেভিয়া-বধ অনন্য


প্রকাশিত: ০৪ মার্চ ২০২১ , ০৮:৪৪ পিএম
যে কারণে মেসিদের এ সেভিয়া-বধ অনন্য

যোগ করা সময়টাও শেষ হয়ে আসছে। আক্রমণটা শেষ হলে শেষ হয়ে যাবে চলতি মৌসুমে কোপা দেল রের আশাও। এমনই সময় অ্যান্টোয়ান গ্রিজমানের ক্রসে পিকের হেডার আছড়ে পড়ল সেভিয়ার জালে। আরেকটা ‘লা রেমুনটাডা’ ইতিহাস রচনা বার্সার। প্রথম লেগে পিছিয়ে পড়েও দ্বিতীয় লেগে দুরন্ত প্রত্যাবর্তন, বার্সেলোনার এমন অভ্যাসটা বহুদিনের। তবে সেভিয়ার বিপক্ষে কোপা দেল রের সেমিফাইনালটা যেন কিছুটা ভিন্নই ছিল। লিওনেল মেসি ঠিক তার মতো ছন্দে ছিলেন না। তারপর সঙ্গে যখন যোগ হয় শেষ এক বছরে ক্লাবের অস্থিতিশীলতা, এই জয়ের মাহাত্ম্য তো বেড়ে যায় বহুগুণে!

৬ মে ২০০৯। এপ্রিলে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের সেমিফাইনালে চেলসির সঙ্গে প্রথম লেগের ফলাফল ছিল গোলশূন্য ড্র। ফিরতি দেখায় বার্সার সমীকরণটা ছিল গোল করে ড্র হলেও ‘অ্যাওয়ে গোল’ সুবিধায় ফাইনালে উঠে যেত ফাইনালে। সে সমীকরণের সামনে থেকে কিনা কাতালানরা পিছিয়ে পড়ে ম্যাচের ৯ মিনিটেই। এরপর সময় গড়াচ্ছে, চেলসির রক্ষণও আরও জমাট হচ্ছে পাল্লা দিয়ে। লিওনেল মেসি, স্যামুয়েল এতো, থিয়েরি অনরিদের একের পর এক আক্রমণ ভেস্তে যাচ্ছে, বাড়ছে বিদায়ের শঙ্কাও। মূল সময় শেষ। অতিরিক্ত সময়ে দানি আলভেসের কাছ থেকে বলটা এলো বাঁ প্রান্তে থাকা মেসির কাছে। তিনি বাড়ালেন আন্দ্রেস ইনিয়েস্তাকে। স্প্যানিশ মিডফিল্ডারের আগুনে শট, আর গোল। ‘অ্যাওয়ে গোল’ সুবিধায় ফাইনালে ওঠে বার্সা। অগুণতি ‘প্রত্যাবর্তনের’ সেই শুরু।

১২ মার্চ ২০১৩। এবারের পরিস্থিতিটা আগেরবারের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। দ্বিতীয় রাউন্ডের প্রথম লেগেই ২-০ গোলের হার। পরের লেগে উঠতে হলে বার্সাকে জিততে হতো কমপক্ষে ৩ গোলের ব্যবধানে। মেসির জোড়া গোলে প্রথমার্ধেই সমতা। এরপর চোটফেরত ডেভিড ভিয়া আর জর্দি আলবার গোলে প্রত্যাবর্তনটা অনায়াসেই সাড়ে কাতালানরা। চ্যাম্পিয়ন্স লিগ প্রথমবারের মতো দেখে প্রথম লেগে দুই গোলে হেরেও নকআউট বাধা উতরে যাওয়ার কীর্তি।

৯ মার্চ ২০১৭। এবারও চ্যাম্পিয়ন্স লিগের দ্বিতীয় রাউন্ড, তবে এ যাত্রায় পিএসজির বিপক্ষে বার্সাকে ডিঙাতে হতো ৪ গোলের ব্যবধান। লুই সুয়ারেজের গোলে শুরু, বিরতির একটু আগে আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা প্রতিপক্ষকে দিয়ে করালেন আত্মঘাতী গোল। বিরতির পর মেসি যখন পেনাল্টি থেকে গোলটা করলেন, ইতিহাস গড়া থেকে তখন দুই গোলের দূরত্বে কাতালানরা। তখনই ঘটল অ্যান্টি ক্লাইম্যাক্স। নিরীহদর্শন এক ফ্রি-কিক থেকে গোল হজম করে বসে বার্সা। সময় গড়াচ্ছিল, তাতে আশাও ফিকে হয়ে আসছিল একটু একটু করে। নেইমারের ফ্রি কিকে গোল এলো ৮৭ মিনিটে। কিন্তু তখনো দুই গোল চাই দলের। যোগ করা সময়ের প্রথম মিনিটে এলো তার প্রথমটা। মেসির বাড়ানো বল আয়ত্বে নেওয়ার আগেই ফাউলের শিকার হন সুয়ারেজ। পেনাল্টি পায় বার্সা, সেখান থেকে নেইমারের গোল। ব্রাজিল তারকার ছোঁয়া রইলো শেষটায়ও। ফ্রি কিক প্রতিহত হলো পিএসজির রক্ষণ দেয়ালে, ফিরে তার কাছেই এলো বলটা। ‘দুর্বল’ বাম পায়ে নিয়ে বলটা আলতো করে লব করে ফেললেন পিএসজি বিপদসীমায়। এরপর সার্জি রবার্তোর অবিস্মরণীয় ভলি শেষ আটে তুলে দেয় বার্সাকে। নিজেদেরই চার বছরের পুরনো রেকর্ড ভেঙে ইতিহাস নতুন করে লেখে কোচ লুইস এনরিকের দল।

৩০ জানুয়ারি ২০১৯। এবার মঞ্চ কোপা দেল রের কোয়ার্টার ফাইনাল। প্রতিপক্ষে এই সেভিয়াই। প্রথম লেগে দুই গোলে হারের বদলাটা কোচ এর্নেস্তো ভালভার্দের দল তোলে ৬-১ গোলের বিশাল এক জয়ে। ফেলিপে কৌটিনিয়োর পেনাল্টিতে শুরু, এরপর একে একে গোলের খাতায় নাম লেখান ইভান রাকিটিচ, সার্জি রবার্তো, মেসি ও সুয়ারেজ। তাতে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ‘অভ্যাসটা’ কোপা দেল রেতেও টেনে আনেন মেসিরা।

তবে চলতি মৌসুমে যেন পিছিয়ে পড়েও জেতার বিষয়টা নিয়মিত ব্যাপারই হয়ে গেছে দলের। কোপা দেল রের আগের দুই ম্যাচে দল জিতেছে পিছিয়ে পড়ে। তৃতীয় রাউন্ডে পুঁচকে কোরনেয়া কে ২-০ গোলে হারাতে খেলতে হয়েছিল অতিরিক্ত সময়। এরপর শেষ ষোলয় রায়ো ভায়েকানোর বিপক্ষে এক গোলে পিছিয়ে পড়েও মেসি আর গ্রিজমানের গোলে জেতে কোচ রোনাল্ড কোম্যানের দল। শেষ আটে ব্যবধানটা ছিল আরো বড়। কেনেডি আর রবার্তো সলদাদোর লক্ষ্যভেদে গ্রানাডার বিপক্ষে ৪৭ মিনিটেই ২-০ ব্যবধানে পিছিয়ে পড়ে বার্সা। গ্রিজমান আর আলবার গোলদুটো আসে ৮৮ আর ৯২ মিনিটে। ২-২ সমতায় থেকে খেলা গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। সেখানে কয়েক প্রস্থ নাটকীয়তার পর শেষমেশ ৫-৩ গোলে শেষ হাসিটা হাসেন মেসিরা।

এরপরই সেমিফাইনালের এই প্রত্যাবর্তন। তবে সেসব প্রতাবর্তনের চেয়ে এবারেরটা আলাদা। প্রাণভোমরা লিওনেল মেসি মাঠে ছিলেন বটে, কিন্তু স্বভাবসুলভ জাদুটা দেখাতে পারেননি। পারেননি গোল করতে কিংবা নিদেনপক্ষে করাতেও। বার্সার কোনো প্রত্যাবর্তনেই এমন কিছু ঘটেনি কখনো।

সঙ্গে যোগ করুন শেষ কয়েক বছরে বার্সেলোনার তথৈবচ পারফর্ম্যান্স আর তার মানসিক ধাক্কাকেও। চ্যাম্পিয়ন্স লিগে টানা দুইবার প্রত্যাবর্তনের শিকার বনেছিল দল। রোমার কাছে হেরেছিল ৩-০ ব্যবধানে আর লিভারপুলের কাছে ৪-০ গোলে। গেল বছর সব মাত্রা ছাড়িয়ে বায়ার্নের কাছে হেরেছিল ৮-২ ব্যবধানে। মেসি ছাড়তে চেয়েছিলেন ক্লাব, অনেক দফা নাটকের পর থেকে গিয়েছিলেন অবশেষে। এরপর সভাপতি হোসে মারিয়া বার্তোমেওয়ের পদত্যাগ, ক্লাবে অশান্তি চলছিলই। যার ছাপ পড়ছিল পারফর্ম্যান্সেও। শেষ ১৮ বছরে সবচেয়ে বাজে সূচনার ফলে লা লিগায় এক সময় চলে গিয়েছিল পয়েন্ট তালিকার সেরা দশ এর বাইরেও। সেসব পরিস্থিতি সামলে কোপা দেল রেতে এমন প্রত্যাবর্তন তো অসাধারণের চেয়েও বেশি কিছুই! ঢাকা পোস্ট