অটোমোবাইল ইন্ডাস্ট্রিতে যে নারীদের অবদান কখনও ভোলার নয়

লেখক: ফাউন্ডার ও ট্রেইনার, বাংলা অটোমোবাইল স্কুল
প্রকাশিত: ০৮ মার্চ ২০১৯ , ০৯:১০ পিএম
অটোমোবাইল ইন্ডাস্ট্রিতে যে নারীদের অবদান কখনও ভোলার নয়

৮ মার্চ বিশ্ব নারী দিবস। বরাবরের মত বিশ্বের অন্যান্য দেশের মত এদেশেও দিনটি উদযাপিত হচ্ছে। বর্তমানে পুরুষের পাশাপাশি সমানতালে নারীরাও এগিয়ে যাচ্ছে বিভিন্ন ক্ষেত্রে। শিক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকরি, প্রশাসন, সংস্কৃতি, বিজ্ঞান সব ক্ষেত্রেই দেখা যায় নারীদের বিচরণ।

অনেকদিন পর্যন্ত তো বটেই, এখনো ধারণা করা হয় মোটরগাড়ি শিল্প বা অটোমোবাইল ইন্ডাস্ট্রি শুধু পুরুষের জন্যই। কিন্তু জেনে অবাক হবেন, অটোমোবাইল ইন্ডাস্ট্রিতে নারীদের অবদান কম নয়। গাড়িতে আমরা বর্তমানে যেসব আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার দেখতে পাই, তার অনেকগুলোর উদ্ভাবনেই রয়েছে নারীদের অবদান। বিশ্ব নারী দিবসে তাই আলোচনা করবো এমন কয়েকজন নারীর কথা, যাদের অবদান অটোমোবাইল ইন্ডাস্ট্রিতে অনস্বীকার্য।

শুরু করা যাক বার্থা বেঞ্জকে দিয়ে। জার্মান নারী বার্থা বেঞ্জ ছিলেন মোটরগাড়ির উদ্ভাবক ও বিখ্যাত গাড়ি নির্মাণ প্রতিষ্ঠান মার্সিডিস বেঞ্জের প্রতিষ্ঠাতা কার্ল বেঞ্জের স্ত্রী। ১৮৮৬ সালে কার্ল বেঞ্জ যখন ঘোড়াবিহীন পেট্রোলচালিত গাড়ি উদ্ভাবন করেন, তখন বার্থা বেঞ্জ গাড়িটি প্রায় ৬৬ মাইল চালান। বার্থা বেঞ্জকেই বিশ্বের প্রথম চালক বা ড্রাইভার বলা হয়। তিনি ৬৬ মাইল গাড়ি চালিয়ে ইতিহাস করেছিলেন এবং তার এই চালনার ফলে কার্ল বেঞ্জের উদ্ভাবন মানুষের নজরে আসে।

এরপর ধরা যাক বর্ষণমুখর একটি দিনের কথা। আপনি গাড়ি চালাচ্ছেন, ধরা যাক গাড়িতে হালকা ভলিউমে গানও বাজছে, এমন সময়ে এলো বৃষ্টি। বৃষ্টির পানিতে গাড়ির সামনের কাচ একদম ভিজে গেল, কিছু দেখাও যাচ্ছে না। এমন সময়ে আপনি কী করেন? নিশ্চয়ই ওয়াইপার চালু করে দেন, তাই তো? আমরা যা-ই ব্যবহার করি তার কিন্তু দুটো ভার্সন থাকে, একটি অটোমেটিক আরেকটি ম্যানুয়াল। মজার ব্যাপার হলো, আমরা বৃষ্টির সময়ে যে ওয়াইপার ব্যবহার করি, তার অটোমেটিক এবং ম্যানুয়াল দুটোরই উদ্ভাবক কিন্তু নারী। ১৯০৩ সালে মেরী অ্যান্ডারসন নামের একজন নারী উদ্ভাবন করেন ম্যানুয়াল ওয়াইপার এবং সেই ওয়াইপারকে ভিত্তি করে তার ১৪ বছর পর ১৯১৭ সালে শার্লট ব্রিজউড উদ্ভাবন করেন অটোমেটিক ওয়াইপার। অটোমেটিক ওয়াইপারে শার্লট ব্রিজউড একধরনের রোলার ব্যবহার করেন, যার মাধ্যমে উইন্ডশিল্ডের উপর চলতে পারতো। একই বছর তিনি অটোমেটিক ওয়াইপারের পেটেন্ট লাভ করেন।

সিনেমাপ্রেমীরা ফ্লোরেন্স লরেন্সের নাম নিশ্চয়ই শুনে থাকবেন, তাকে বিশ্বের প্রথম মুভি স্টার বলা হয়। কিন্তু আমি বলবো বিউটি উইথ এ ব্রেইন। বলা বাহুল্য, এই ফ্লোরেন্স লরেন্স উদ্ভাবন করেছিলেন দুটো গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি, যার ব্যবহার ছাড়া আজকাল গাড়ির কথা ভাবাই যায় না। তার প্রথম উদ্ভাবন ছিলো ‘অটো সিগনালিং আর্ম’, যা বর্তমানের সিগনাল বা ইন্ডিকেটর লাইটের পূর্ব সংস্করণ। ফ্লোরেন্স লরেন্স অটো সিগনালিং আর্ম হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন দুটি পতাকা, যা লাগানো থাকতো গাড়ির পেছনে এবং একটি স্বয়ংক্রিয় বোতামে চাপ দিলে সেই পতাকাগুলো নড়তে শুরু করতো।

ফ্লোরেন্স লরেন্সের অন্য উদ্ভাবনটি হলো স্টপ ব্রেক। আমরা এখন গাড়িতে ব্রেক কষলে গাড়ির পেছনে যেরকম ব্রেক লাইট জ্বলে ওঠে, তেমনই সেই সময়ে ফ্লোরেন্সের আবিষ্কৃত প্রযুক্তিতে গাড়িতে ব্রেক কষলেই পেছন দিকে একধরনের ওয়ার্নিং সাইন জ্বলে উঠতো। তিনি এ দুটো উদ্ভাবনের পেটেন্ট করার চেষ্টা করেছিলেন কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত তিনি উদ্ভাবনদ্বয়ের জন্য কোনো সম্মান বা ক্রেডিট পাননি।

এরপর আসা যাক ডরোথি পুলিঞ্জারের কথায়। তিনি শুধু বিশ্বের প্রথম মহিলা গাড়ি ডিজাইনারদের একজন ছিলেন না, বরং তিনি বিশ্বের প্রথম কার ডিজাইনার। যিনি গাড়ি ডিজাইন করেছিলেন নারীদের চাহিদা এবং প্রয়োজনকে ভিত্তি করে। ডরোথির বাবা ছিলেন স্কটল্যান্ডের তৎকালীন গাড়ি নির্মাণ প্রতিষ্ঠান এরল জনস্টনের ম্যানেজার। সেই সুবাদেই মাত্র ১৬ বছর বয়সে ডরোথি ঢোকেন এরল জনস্টনে। এছাড়া সে সময়ে তিনি ইনস্টিটিউশন অব অটোমোবাইল ইঞ্জিনিয়ার্সে জয়েন করার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু মেয়ে বলে সেই সময়ে তাকে জয়েন করতে দেওয়া হয়নি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর তার বাবা তাকে এরল জনস্টনের সাবসিডারি কোম্পানি গ্যালোওয়ে মোটরসের ইনচার্জ হিসেবে ঢুকিয়ে দেন। ইনচার্জ হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পর ডরোথি কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে নারীদের গুরুত্ব দেন এবং তার হাত ধরেই গ্যালোওয়েতে অনেক নারীকর্মী নিযুক্ত হন। ডরোথি অন্যান্য নারীকর্মীদের নিয়ে ফিয়াট ৫০১ গাড়ির আদলে তৈরি করেন গ্যালোওয়ে ১০/২০। পরবর্তীতে ডরোথি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অংশ নেন। ১৯৮৬ সালে তিনি ৯২ বছর বয়সে মারা যান।

এরকম আরেকজন কার ডিজাইনার হলেন হেলেন রোথার, যিনি ১৯৪২ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে ফ্রান্স থেকে তার ৭ বছরের মেয়ে নিয়ে পালিয়ে চলে যান যুক্তরাষ্ট্রে। সেখানে কিছুদিন বিখ্যাত মারভেল কমিক্সের চিত্রশিল্পী হিসেবে কাজ করেন। এরপর তিনি যোগ দেন জেনারেল মোটরসে। হেলেন রোথার ছিলেন জেনারেল মোটরসের প্রথম নারী কার ডিজাইনার। জেনারেল মোটরসে কিছুদিন কাজ করার পর তিনি নিজেই একটি কার ডিজাইন ফার্ম প্রতিষ্ঠা করেন।

এবার চলে আসি আধুনিক যুগে। ২০১৪ সালে জেনারেল মোটরসের তৎকালীন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড্যান একারসন পদত্যাগ করেন এবং তার স্থলাভিষিক্ত হন মেরী বারা। বিশ্বের বৃহত্তম গাড়ি নির্মাণ প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে তিনিই প্রথম নারী প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা। ১৯৮০ সালে জেনারেল মোটরসে যোগ দেওয়া মেরী পেশায় একজন ইলেক্ট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। জেনারেল মোটরসের প্রধান নির্বাহী হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার আগে তিনি জেনারেল মোটরসের গ্লোবাল প্রোডাক্ট ডেভেলপমেন্ট বিভাগের এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে কিছুদিন কাজ করেন। ২০১৫ সালে তিনি টাইম ম্যাগাজিনে বিশ্বের ১০০ জন প্রভাবশালী মানুষের একজন হওয়ার সম্মান লাভ করেন।

আধুনিক যুগে অটোমোবাইল ইন্ডাস্ট্রিতে অবদান রাখা আরেকজন নারীর নাম মিশেল ক্রিস্টেনসেন। আধুনিক যুগের গাড়ির ডিজাইনে মিশেলের অবদান কোনভাবেই অস্বীকার করা যায় না। যুক্তরাষ্ট্রের স্যান হোসে জন্ম নেওয়া মিশেল কার ডিজাইনের ওপর পড়াশোনা করেছেন। তিনি হোন্ডা এনএসএক্স (যুক্তরাষ্ট্রে একুরা এনএসক্স) গাড়ির ডিজাইন করেন, যা ২০১২ সালে ডেট্রয়েট অটো শোতে উদ্বোধন হয়। বর্তমানে তিনি বিখ্যাত গাড়ি নির্মাণ প্রতিষ্ঠান হোন্ডার প্রিন্সিপাল ডিজাইনার হিসেবে কাজ করছেন। নারীদের জন্য একটি আনন্দের খবর এই যে, সম্প্রতি মিশেলকে হোন্ডার একটি সুপারকার ডিজাইন করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। সেই তথ্য অনুযায়ী, মিশেল বিশ্বের প্রথম নারী সুপারকার ডিজাইনার। মিশেলের ডিজাইন করা গাড়িগুলোর মধ্যে হোন্ডা এনএসএক্স, একুরা আরএল, একুরা জেডডিএক্স অন্যতম।

প্রিয় পাঠক, বেশ কয়েকজন নারীর কথা বললাম, যারা অটোমোবাইল ইন্ডাস্ট্রিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন এবং রাখছেন। অটোমোবাইল ইন্ডাস্ট্রিতে বাংলাদেশি নারীদের অংশগ্রহণ বা অবদান কি নেই? কে বলেছে নেই? অবশ্যই আছে। বর্তমানে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত অনেক নারী জেনারেল মোটরসে কাজ করছেন। ভবিষ্যতে তাদের নিয়ে লেখার ইচ্ছা আছে।

ম্যারি এন্ডারসন, বার্থা বেঞ্জসহ অন্য যারা অটোমোবাইল ইন্ডাস্ট্রিতে অবদান রেখেছেন, তাদের প্রতি নারী দিবসে শ্রদ্ধা জানাই। আশাকরি বার্থা বেঞ্জ, ম্যারি এন্ডারসন প্রমুখের হাত ধরে নারীরা অটোমোবাইল ইন্ডাস্ট্রিতে তাদের দক্ষতা দেখিয়েছে এবং কাজ করছে। আশা রাখবো, এ ধারাবাহিকতা ভবিষ্যতেও বজায় রাখবে নারীরা।

লেখক: ফাউন্ডার ও ট্রেইনার, বাংলা অটোমোবাইল স্কুল।