বাগান তৈরীর প্রাচীন ইতিহাস

ফিচার ডেস্ক
প্রকাশিত: ২৪ অক্টোবর ২০১৮ , ০৫:২৩ পিএম
বাগান তৈরীর প্রাচীন ইতিহাস

প্রাচীনকাল থেকেই বাগান করার প্রচলন শুরু হয়। প্রথমদিকে রাজাদের উদ্যোগে এই বাগান গড়ে ওঠে। পরবর্তীতে সরকারি এবং ব্যক্তিগত উদ্যোগে পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় অনেক বাগান গড়ে ওঠে। কৃষকরাই প্রথম নিজেদের খাদ্যের চাহিদা মেটানোর জন্য বাড়ির আঙিনায় এবং আশেপাশের খালি জায়গায় প্রয়োজন মতো শাকসবজি এবং ফসলের চাষ শুরু করেন। নিজেরাই সেসব গাছপালার যত্ন নিতেন। উৎপাদিত ফসলের বেশিরভাগই পরিবার এবং তাদের গৃহপালিত পশুপাখির খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করতেন। পরে ধীরে ধীরে চাষের জমির পরিসর বাড়তে থাকে। কিন্তু মানুষের রুচি, সৌন্দর্য আর চাহিদার বাগান রূপ পায় আরো পরে।

প্রাচীন মিশরে বাগানের প্রচলন : প্রাচীন মিশরে বাগান করার প্রচলন ছিল। সেখানে বাগানগুলো করার পেছনে ধর্মীয় তাৎপর্যও ছিল। প্রাচীন মিশরে বিভিন্ন দেবতার নামে বিভিন্ন গাছ উৎসর্গীকৃত ছিল। মিশরের অধিবাসীরা বিশ্বাস করতেন, দেবতারা বাগান ভালবাসেন। মন্দিরের দেবতাদের জন্য তারা বাগান করতেন। প্রাচীন মিশরের অধিবাসীরা ফুলের চাষ করতেন। উৎপাদিত ফুল দিয়ে তৈরি ফুলের তোড়া শুধু বাগান মালিকের জন্যই নয়, দেবতার উদ্দেশ্যেও নিবেদন করা হতো। রাজপ্রাসাদের সাজসজ্জায়, ফুলের মালা দিয়ে সম্মানিত কাউকে বরণ করে নিতে, এমনকি রাজমুকুটেও শোভা পেতো ফুল- যা আসতো বাগান থেকে। প্রত্নতাত্ত্বিকরা তুতেনখামেনের কফিনে বিভিন্ন ফুলের নকশা দেখতে পান, যা থেকে ধারণা করা হয়, প্রাচীন মিশরে বাগান করার প্রচলন ছিল।

রোমানদের তৈরি বাগান : ৩০ খ্রিস্ট পূর্বাব্দে রোমানরা যখন মিশর জয় করেন, তখন বাগান সংক্রান্ত মিশরীয় ধারণাগুলো রোমানরা আয়ত্ত করতে সক্ষম হন। ধনী রোমানরা তাদের প্রাসাদ ও বাসভবনের সামনে বাগান শুরু করেন। বাগানের গাছের রক্ষণাবেক্ষণে রোমানরা বেশ দক্ষতা দেখান। তারা বাগানকে সুন্দরভাবে উপস্থাপন করতে বাগানে নানারকম ভাস্কর্য, ফোয়ারা স্থাপন করেন।

গ্রিক সভ্যতায় বাগান : গ্রিকরা বাগান তৈরিতে তেমন দক্ষ ছিলেন না। মন্দিরের চারপাশে ছায়া দেবার জন্য মন্দিরের চারধারে বড় বড় গাছ লাগাতে পছন্দ করতেন তারা। কিন্তু অন্যান্য জায়গায় কিংবা আনন্দের জন্য কেউ বাগান করতেন না। গ্রিকরা ফুলের গাছ বাড়ির আঙিনার খোলা পরিবেশে লাগানোর চেয়ে পাত্রে লাগাতে বেশি পছন্দ করতেন। ফুলের বাগানের পরিবর্তে গ্রিসের পূর্বাঞ্চলে গড়ে ওঠে ফলের বিশাল সব বাগান। ফলের বাগানের রক্ষণাবেক্ষণে তারা মনোযোগও বেশি দিতেন। পরবর্তী সময়ে এসব অঞ্চলে ফলের বাগানের সাথে নানা শাকসবজির বাগান গড়ে তুলেছিলেন গ্রিসের অধিবাসীরা।

মধ্যযুগে ইসলামী শাসকদের উদ্যোগে বাগান নির্মাণ : সপ্তম শতকে আরবরা এক বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন। তারা যখন পারস্য জয় করেন, তখন পার্সিয়ানদের বাগান সম্পর্কিত অনেক ধারণাই আরবরা গ্রহণ করেন। এদের বাগানগুলো প্রাচীরবেষ্টিত ছিল এবং বাগানের চারদিকে পানির ব্যবস্থা রাখা ছিল। বাগানের মাঝখানে তৈরি হয়েছিল পানি সংরক্ষণের বিশাল জলাশয়। বাগানে পানির ফোয়ারার ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। বাগানের চত্বর মোজাইক, টাইলস দিয়ে সজ্জিত করা হয়েছিল। বাগানের সাইপ্রাস গাছগুলো বাগানের ছায়ার কাজ করতো। আরবরা বাগানে ফল গাছের চারাও রোপণ করতেন। অষ্টম শতকে স্পেন জয় করার পর আরবরা সেসব দেশ থেকে নানা রকম ফুল, ফল এবং বিশেষ প্রজাতির উদ্ভিদ নিয়ে এসে তাদের বাগানকে সমৃদ্ধ করেন।

মধ্যযুগে ইউরোপে বাগান চর্চা : ত্রয়োদশ শতকে ইউরোপীয়রা বাগান তৈরিতে এবং বাগান পরিচর্যায় বিবর্তন নিয়ে আসেন। ধনীরা আনন্দের জন্য বাগানে ফুলের গাছের সাথে সাথে নানা রকম ঔষধি গাছ ও সবজির চাষ করতেন। মধ্যযুগের অধিকাংশ বাগানে বন্যপ্রাণীদের থেকে বাগানের গাছগুলোকে রক্ষার জন্য এবং বাগানের নির্জনতার উপভোগ করার জন্য প্রাচীর দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল।

ষোড়শ ও সপ্তদশ শতকের বাগান : ষোড়শ ও সপ্তদশ শতকে গ্রিস ও রোমে বাগান শিল্প আবার পুনরুজ্জীবন লাভ করে। এই সময় বাগান তৈরিতে সমতা, অনুপাত এবং ভারসাম্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এই সময় বাগানের বেডগুলো তৈরিতে বেশ স্বকীয়তা দেখা যায়। বাগানের গাছগুলো বর্গাকৃতির বা গোলাকার সাজে সজ্জিত করা হয়। গাছগুলোর মাঝখানে নুড়ি বিছানো পথ তৈরি করা হয়। ষোড়শ শতকের বাগানে রোমের সেই পুরনো ঐতিহ্যকে আবার ফিরিয়ে আনা হয়। ভাস্কর্য, ঝর্ণা এবং পোড়ামাটির নানা কারুকার্য সম্বলিত নান্দনিক সৃষ্টিকর্মে বাগানগুলোকে আকর্ষণীয় করে তোলা হয়। এই সময়ে ইউরোপের বাগানগুলোতে অনেক নতুন উদ্ভিদের চারা রোপণ করা হয়, যার মধ্যে ছিল টিউলিপ, ম্যারিগোল্ড, সূর্যমুখী প্রভৃতি। এ সময় আলু ও টমেটোর চাষ শুরু হয় ইউরোপে।

অষ্টাদশ ও উনবিংশ শতকের বাগান : অষ্টাদশ ও উনবিংশ শতকে উদ্ভিদ বিজ্ঞানীদের গবেষণার জন্য খুব লোভনীয় জায়গা হয়ে ওঠে বাগান। বাগানগুলোকে আরও প্রকৃতির কাছাকাছি নিয়ে আসার ভাবনা এই সময়ে শুরু হয়। এই সময়ের দুটি বিখ্যাত বাগান নির্মাণ করেন উইলিয়াম কেন্ট এবং চার্লস ব্রিজম্যান। উইলিয়াম কেন্ট রুশাম এবং চিসউকে দুটি বাগান নির্মাণ করেন। এই দুজন বাগান তৈরিতে নতুনত্ব নিয়ে আসেন।
১৭২৫ সালে ইংল্যান্ডে সোসাইটি অফ গার্ডেনার প্রতিষ্ঠিত হয়। অষ্টাদশ শতকে এসে বাগান তৈরিতে উচ্চবিত্তদের সাথে মধ্যবিত্তরাও যুক্ত হতে থাকে। এই সময়ে বিনোদন এবং সামাজিক প্রতিপত্তি বোঝাতে এই বাগানগুলো নির্মিত হতে থাকে। আমেরিকার প্রথম ‘বোটানিক্যাল গার্ডেন’ তৈরি হয় ১৭২৮ সালে। সেটি হলো ফিলাডেলফিয়া গার্ডেন। তারপর তৈরি হলো ১৮৯৬ সালে ‘নিউ ইয়র্ক বোটানিক্যাল গার্ডেন’।

উনবিংশ ও বিংশ শতকের বাগান : ১৮০৪ সালে হর্টিকালচারাল সোসাইটি গঠিত হয়। ১৮২২ সালে ডা. নাথানিয়াল বাগশাও হঠাৎই আবিষ্কার করেন যে, কিছু উদ্ভিদকে বদ্ধ কাঁচের ঘরে রাখা হলে নিজেদের বেঁচে থাকার জন্য এসব উদ্ভিদ সেখানেই নিজেদের উপযোগী জলবায়ু গড়ে তোলে। এই গ্রিন হাউস প্রযুক্তি বাগান শিল্পে নব বিপ্লব নিয়ে আসে। আধুনিক এই হর্টিকালচারাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গা থেকে উদ্ভিদ এনে অনাবাদী জমিতে রোপণ করা সহজসাধ্য হয়েছে। এ সময় অনেক নতুন ধরনের গাছের বীজ এবং চারা তৈরিতে সক্ষম হয় ইউরোপীয়রা। ফলে বাগানগুলোতে নতুন ধরনের গাছের সমাবেশ ঘটতে থাকে।

উনবিংশ শতকের মাঝামঝি সময়ে গ্রিন হাউজ প্রযুক্তি বাগান শিল্পে বড় ধরনের সাফল্য নিয়ে আসে। এর ফলে প্রচন্ড গরম ও শীতে গাছকে সহজে বাঁচিয়ে রাখা যায়। এই সময় গাছের চারার জন্য আলাদা বেডিং তৈরির চল শুরু হয়। গাছকে একটি নির্দিষ্ট সাইজে রাখার জন্য কাটিং করা, গাছের নির্দিষ্ট আকার দেয়ায় বাগান আরও দৃষ্টিনন্দন হয়ে ওঠে। এ সময় পাহাড়ের ওপর বাগান তৈরিতে সফল হয় ইউরোপীয়রা। উনবিংশ শতকের একজন বিখ্যাত গার্ডেনারের নাম জন ক্লডিয়াস লাউডন। বাগান তৈরিতে স্যার চার্লস ব্যারি, উইলিয়াম রবিনসন মতো ব্যক্তিরা এ সময় বাগান তৈরিতে নতুন নতুন ধারণার প্রবর্তন করেন। এ সময়ে ধনী এবং সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিরা সমাজে নিজেদের প্রতিপত্তি বোঝাতে দৃষ্টিনন্দন বাগান বাড়ি বা ফার্ম হাউজ গড়ে তোলেন। এভাবে বিভিন্ন সময়ে সারা বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে বাগান শিল্প ধারাবাহিকভাবে উৎকর্ষ লাভ করে।