সাইবার অ্যাটাক : টার্গেট বাংলাদেশ

তথ্যপ্রযুক্তি ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৬ মে ২০১৭ , ০২:১৭ পিএম
সাইবার অ্যাটাক : টার্গেট বাংলাদেশ

আন্তর্জাতিক মার্কেটপ্লেসে কাজ করেন রবিউল ইসলাম (২৬)। প্রতিমাসে গড়ে ৫০০ ডলারের পেমেন্ট নিয়ে আসেন একটি বেসরকারি ব্যাংকে। খরচের টাকা তুলে অবশিষ্ট টাকা জমা রাখেন ওই অ্যাকাউন্টেই। লেনদেনের সব বিবরণ নিয়মিত আপডেট পান এসএমএস ও ই-মেইলে।

২০১৪ সালের এক বৃহস্পতিবার রাত ৩টায় মোবাইলে হঠাৎ এসএমএস। রবিউলের অ্যাকাউন্ট থেকে ৪৫ হাজার টাকা ট্রান্সফার করা হয়েছে অন্য অ্যাকাউন্টে। অথচ তখন তিনি গভীর ঘুমে। বাংলাদেশেরই একদল হ্যাকার ‘ব্রুট ফোর্স অ্যাটাক’ (বিশেষ ধরনের হামলা) করে তার ইউজার নেম ও পাসওয়ার্ড চুরি করে সহজেই ওই টাকা সরিয়ে ফেলেন।

পরে ২০১৬ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট থেকে ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার (প্রায় ৮০৮ কোটি টাকা) সরিয়ে নেয় চীনা হ্যাকাররা। যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্কে গচ্ছিত রাখা ওই টাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে তারা ফিলিপাইন ও শ্রীলঙ্কায় নিয়ে যায়।

বাংলাদেশের হ্যাকিংয়ের এর চিত্র অনেকটা এমনই। এখানে হ্যাকারদের প্রধান লক্ষ্য ব্যাংক। এছাড়া মাঝে মধ্যে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট, অনলাইনভিত্তিক ব্যক্তিগত আকাউন্টেও হ্যাকের খবর মেলে গণমাধ্যমে।

বিভিন্ন ধরনের হ্যাকিং ও প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে পাচার হচ্ছে হাজার কোটি টাকা। ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটির (জিএফআই) ‘ইলিসিট ফিন্যান্সিয়াল ফ্লোস ফ্রম ডেভেলপিং কান্ট্রিস: ২০০৪-১৩’ শীর্ষক প্রতিবেদন বলছে, শুধু ২০১৩ সালেই অবৈধ পথে বাংলাদেশের বাইরে চলে গেছে ৯৬৬ কোটি ডলারের বেশি। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ৭৫ হাজার কোটি টাকা। ২০১২ সালে পাচার হয়েছিল ৭২২ কোটি ৫০ লাখ ডলার। এ হিসাবে এক বছরের ব্যাবধানে বাংলাদেশ থেকে অবৈধ অর্থ প্রবাহ বেড়েছে ৩৩ শতাংশ। আর গত ১০ বছরে পাচার হওয়া অর্থের পরিমাণ ৫ হাজার ৫৮৭ কোটি ৭০ লাখ ডলার।

কয়েক বছরে দেশের সরকারি ওয়েবসাইটগুলোতে হ্যাকিংয়ের ঘটনা বাড়ছে। প্রযুক্তিগত নানা দুর্বলতার কারণে দেশি-বিদেশি হ্যাকাররা এসব ওয়েবসাইটে হানা দিয়ে সহজেই দখল নিতে পারছে।

২০১৬ সালের ১৪ জুন বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইট হ্যাক করে ‘কসোভো লিবারেশন আর্মি’ নামের একটি হ্যাকার গ্রুপ। সাইবার নিরাপত্তা বিষয়ক পোর্টাল জোন এইচ বলছে, ২০১৪ সালের ১৯ জুন ও ২০১৬ সালের ১৮ মে দুই দফা নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইট হ্যাক হয়।

চলতি বছর এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কন্ট্রোলার জেনারেল ডিফেন্স ফাইন্যান্স (সিজিডিএফ) এর ওয়েবসাইট হ্যাকড হয়। এর আগে তথ্য মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট হ্যাক করে বলিউড অভিনেত্রী ও আইটেম গার্ল সানি লিওনের ছবি ঝুলিয়ে দেয় ভারতীয় হ্যাকাররা।

২০১৬ সালের ২২ অক্টোবর হ্যাকাররা কিছু সময়ের জন্য নিয়ন্ত্রণে নেয় অর্থ মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট। সাইটের দুর্বলতা প্রকাশ করে ওয়েবসাইটে কিছু বার্তা ঝুলিয়ে দেয় হ্যাকাররা।

সূত্র বলছে, বর্তমান সরকারের ‘ভিশন - ২০২১’ এর অংশ হিসেবে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের ৬০টি ওয়েবসাইট তৈরি করা হয়। তবে নিরাপত্তা ত্রুটির কারণে সকাইটগুলো একসময় দেশি-বিদেশি হ্যাকারদের লক্ষ্যে পরিণত হয়। সমস্যা সমাধানে পরে সরকার আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে ২৫ হাজার সাইটের ওয়েবপোর্টাল চালু করে। তবে সমস্যা এখনো পুরোপুরি সমাধান হয়নি।

সাইবার নিরাপত্তা বিষয়ক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ক্যাসপারস্কি ‘আইটি থ্রেট ইভোলিউশন ইন কিউ থ্রি টু থাউজেন্ড ফিফটিন’ অনুযায়ী, মোবাইল সাইবার ঝুঁকিতে শীর্ষে আছে বাংলাদেশ। এখানে প্রতি চারটি ডিভাইসের অন্তত একটি ভাইরাসে আক্রান্ত। আর ২১৩টি দেশের মধ্যে কম্পিউটারে ভাইরাসের আক্রমণের দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান ১৯তম। এছাড়া ‘আইটি অপারেশনস অব ব্যাংক’ শীর্ষক এক গবেষণার তথ্যে, দেশের ৫২ শতাংশেরও বেশি ব্যাংকিং তথ্য নিরাপত্তা ঝুঁকিতে রয়েছে। এর মধ্যে ১৬ শতাংশ খুবই উচ্চ নিরাপত্তা ঝুঁকিতে ও ৩৬ শতাংশ উচ্চ নিরাপত্তা ঝুঁকিতে।

প্রযুক্তিবিদরা বলছেন, দেশে প্রযুক্তির উৎকর্ষতার সঙ্গে সঙ্গে দিন দিন হ্যাকিংয়ের ঝুঁকিও বাড়ছে। নানা মাধ্যমে হ্যাকাররা সক্রিয়, যাদের প্রধান লক্ষ্য অর্থ লেনদেনের মাধ্যম। আর ওয়েবসাইটগুলোর নিরাপত্তা সুরক্ষিত না হওয়ায় দেশি-বিদেশি হ্যাকাররা সহজেই এগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিচ্ছে।